
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু এই ব্যস্ত ঘাটটি এখন যাত্রীদের জন্য যেন এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস সোজা পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। সৌভাগ্যবশত, বাসে থাকা ৩৭ জন যাত্রী ফেরিতে ওঠার আগেই গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছিলেন বলে একটি বড় ধরনের ট্র্যাজেডি এড়ানো গেছে। তবে এই ঘটনায় বাসের চালক ও তার সহকারী নদীতে পড়ে যান এবং পরে স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন।
এই দুর্ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গত মার্চ মাসের এক ভয়ানক স্মৃতি নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। মাত্র কয়েক মাস আগে, গত ২৫ মার্চ কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ঠিক একইভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে গিয়েছিল। ওই মর্মান্তিক ঘটনায় ২৬ জন নিরীহ যাত্রী প্রাণ হারিয়েছিলেন। এতগুলো মানুষের তাজা প্রাণ যাওয়ার পরও ফেরিঘাটগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ১০০% উন্নতি কেন হলো না, তা নিয়ে এখন সাধারণ মানুষ ও যাত্রীদের মনে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর ফেরিঘাটগুলোতে এমন দুর্ঘটনার কারণে পরিবহন খাতকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। একেকটি বড় বাসের দাম প্রায় ৫০,০০০থেকে৬০,০০০(ডলার) বা অর্ধকোটি টাকার বেশি।
এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহনের দৌলতদিয়া ঘাটের তত্ত্বাবধায়ক বারেক শেখ আজকের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি জানান, কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা বাসটিতে মোট ৩৭ জন যাত্রী ছিলেন। বাসের চালক, সহকারী এবং সুপারভাইজার মিলিয়ে বাসে মোট ৪০ জনের মতো মানুষ ছিলেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসটি দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটে ফেরিতে ওঠার জন্য ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। ওই সময় ঘাটের বাঁ পাশের একটি পকেটে ‘বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর’ নামের একটি বড় রো রো ফেরি নোঙর করা ছিল। অপর পকেটে আরেকটি মাঝারি আকারের ফেরি অপেক্ষা করছিল। বাসটি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ফেরিতে ওঠার জন্য র্যাম্পের (ফেরি ও পল্টুনের মাঝখানের সংযোগ সেতু) দিকে যাচ্ছিল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় বিপত্তি। ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করার সময় বাসটি হঠাৎ করে চালকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সোজা না গিয়ে বাসটি ডান দিকে বেঁকে যায় এবং তীব্র গতিতে মাঝারি ফেরির র্যাম্পে গিয়ে সজোরে আঘাত করে। এই প্রবল ধাক্কায় র্যাম্পটি ভেঙে যায় এবং বাসটি মুহূর্তের মধ্যে সরাসরি পদ্মা নদীর অথৈ পানিতে ছিটকে পড়ে। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ঘাটের কর্মীরা বাসের সব যাত্রীকে আগেই নামিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু চালক ও তার সহকারী বাসটির ভেতরে ছিলেন। বাসটি পানিতে পড়ার পর চালক ও সহকারী কোনোমতে বের হয়ে আসেন। পরে তাদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
দুর্ঘটনার সময় ঘাটে থাকা আল জুবায়ের নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রী ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফেরিঘাটে আসার পর বাসের সব যাত্রীকে নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর চালক ও তার সহকারী বাসটি নিয়ে ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করেন। আমি স্পষ্ট দেখলাম, বাসটি সোজা না গিয়ে হঠাৎ ডান দিকে বেঁকে যায় এবং চোখের পলকে পানিতে পড়ে যায়। আমরা সবাই ভয়ে চিৎকার করে উঠি। যাত্রীরা যদি বাসের ভেতরে থাকতেন, তবে আজ এখানে লাশের পাহাড় জমে যেত। এমন ঘটনা নিজের চোখে দেখলে আর কখনো বাসে চড়ে ফেরি পার হওয়ার সাহস থাকে না।”
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই বিআইডব্লিউটিসি, বিআইডব্লিউটিএ, নৌ পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন জানান, ফায়ার সার্ভিস ও নৌ পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ঘটনাস্থলে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত এই দুর্ঘটনায় বড় ধরনের কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বাসটি ঠিক কী কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি চালকের অদক্ষতা, গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি ঘাটের র্যাম্পের কোনো সমস্যা ছিল, তা খুঁজে বের করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে তিনি জানান।
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সাথে রাজধানীর যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রতিদিন এই ঘাট দিয়ে প্রায় তিন থেকে চার হাজার যানবাহন পারাপার হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেরিঘাটগুলোর পন্টুন ও র্যাম্পগুলো অনেক পুরোনো এবং ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করায় বৃষ্টি বা কাদার সময় এগুলো অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে যায়। এর ফলে গাড়িগুলো সহজে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। যাত্রীদের ১০০% নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কর্তৃপক্ষকে এখনই ঘাটের আধুনিকায়ন করতে হবে এবং চালকদের আরও বেশি সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিতে হবে।
https://slotbet.online/